বিশেষ সংবাদ
“স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত”—কোরআন-হাদিস কী বলে?
ইসলামি সমাজে বহুল প্রচলিত একটি বাক্য হলো— **“স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত।”** তবে ইসলামি গবেষক ও মুহাদ্দিসদের মতে, এই বাক্যটি **কোরআনের আয়াত নয় এবং সহিহ হাদিস হিসেবেও প্রমাণিত নয়**। বরং এটি একটি **ভুলভাবে প্রচলিত সামাজিক উক্তি**। ### তাহলে ইসলামে স্ত্রীর মর্যাদা কী? কোরআন ও সহিহ হাদিসে স্ত্রীর জন্য স্বামীর প্রতি সদাচরণ, পারিবারিক দায়িত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের কথা বলা হয়েছে। তবে জান্নাত লাভকে কখনোই **একতরফা দাসত্ব বা পায়ের নিচে থাকার সঙ্গে শর্তযুক্ত করা হয়নি**। বরং কোরআন বলছে— “তাদের (স্বামী-স্ত্রী) পরস্পরের জন্য পোশাকস্বরূপ।” —(সুরা বাকারা : ১৮৭) অন্যদিকে, সহিহ হাদিসে এসেছে— **“মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।”** এটি একটি প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য হাদিস, যা অনেক সময় ভুলভাবে স্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। ## ইসরা ও মি‘রাজ : কোরআনের অকাট্য ঘোষণা কোরআনে বর্ণিত এক অলৌকিক ও ঐতিহাসিক ঘটনার সূচনা হয়েছে **সুরা বনী-ইসরাঈল (সুরা আল-ইসরা), আয়াত ১**–এর মাধ্যমে। ### আয়াতের সরল অনুবাদ **“পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের এক অংশে ভ্রমণ করালেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত—যার আশপাশে আমরা বরকত দান করেছি—যেন আমরা তাকে আমাদের নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”** ### সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা – **“সুবহান”** শব্দ দ্বারা আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ পবিত্রতা ও অসীম ক্ষমতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। – **“আসরা বিআব্দিহি”** (নিজের বান্দাকে ভ্রমণ করালেন)—এই শব্দচয়ন প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইসরা ও মি‘রাজ **শুধু আত্মিক নয়, বরং দেহ ও আত্মা উভয় অবস্থায় সংঘটিত হয়েছিল**। – **“লাইলান”** (রাতের এক অংশে) শব্দ দ্বারা বোঝানো হয়েছে, এই সফর সম্পূর্ণ রাতজুড়ে নয়, বরং অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। ## ইসরা ও মি‘রাজ : ইতিহাস ও হাদিসের সাক্ষ্য ইমাম ইবনে কাসীর, ইমাম কুরতুবীসহ বহু মুহাদ্দিসের মতে, – **ইসরা**: মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফর – **মি‘রাজ**: সেখান থেকে আসমানসমূহে আরোহণ এই ঘটনা **কোরআন, সহিহ ও মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত**। ### সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে— আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, “বিশ্বের প্রথম মসজিদ মসজিদুল হারাম, এরপর মসজিদুল আকসা। উভয়ের নির্মাণের মধ্যে ব্যবধান চল্লিশ বছর।” ### বুখারি শরিফে এসেছে— কুরাইশরা যখন মি‘রাজের ঘটনা অস্বীকার করে, তখন আল্লাহ তাআলা **বাইতুল মুকাদ্দাস রাসুল ﷺ-এর সামনে স্পষ্ট করে দেন**, এবং তিনি তার নিখুঁত বর্ণনা দেন। ## স্বপ্ন নয়, বাস্তব সফর ইসরা ও মি‘রাজ যদি কেবল স্বপ্ন হতো, তবে— – কাফেরদের উপহাস, – সাহাবিদের ঈমানের পরীক্ষা, – কুরাইশদের প্রশ্নবাণ এসব ঘটত না। এ কারণেই ইমাম ইবনে কাসীর স্পষ্টভাবে বলেন— **“ইসরা ও মি‘রাজ জাগ্রত অবস্থায়, দেহ ও আত্মাসহ সংঘটিত হয়েছিল।”** ## উপসংহার একদিকে যেমন **“স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত”**—এই কথাটি কোরআন ও সহিহ হাদিসসম্মত নয়, অন্যদিকে **ইসরা ও মি‘রাজ** ইসলামের এমন এক ঘটনা, যা **অকাট্য দলিল, কোরআনের আয়াত ও অসংখ্য সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত**। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই **ন্যায়, দায়িত্ব ও তাকওয়ার ভিত্তিতে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়**, কোনো ভিত্তিহীন সামাজিক কথার মাধ্যমে নয়।
Facebook Comments