জাতীয়
সাংবাদিকতা কি এখন যোগ্যতার নয়, টাকার খেলা? ভুয়া সাংবাদিকতায় প্রশ্নবিদ্ধ পেশার বিশ্বাসযোগ্যতা!
মোঃ শাজনুস শরীফঃ এক সময় সাংবাদিক পরিচয় মানেই ছিল দায়িত্ব, সাহস ও নৈতিকতার প্রতীক। সমাজের অন্যায়, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরাই ছিল সাংবাদিকতার মূল শক্তি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই গৌরবময় পেশাই আজ গভীর সংকটে। প্রশ্ন উঠছে—সাংবাদিক হওয়া কি এখন আর যোগ্যতার বিষয়, নাকি এটি পরিণত হয়েছে ভয়ংকর রকমের সস্তা এক পরিচয়ে?সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, কিছু পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও নামসর্বস্ব আইপি টিভি সামান্য অর্থের বিনিময়ে যাচাই-বাছাই ছাড়াই সাংবাদিক পরিচয়ের আইডি কার্ড সরবরাহ করছে। নেই কোনো প্রশিক্ষণ, নেই নৈতিকতা যাচাই, নেই পেশাগত ব্যাকগ্রাউন্ডের মূল্যায়ন। শুধু টাকা দিলেই মিলছে “সাংবাদিক” তকমা। এর ফলে তৈরি হচ্ছে এক শ্রেণির কার্ডধারী সাংবাদিক, যাদের হাতে কলম নয়—হাতে থাকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার।এই ভুয়া সাংবাদিকতার ভয়াবহ পরিণতি প্রতিনিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে। প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ভূমি দখল কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের পকেট থেকে উদ্ধার হচ্ছে প্রেস কার্ড। পরিচয় হিসেবে উঠে আসছে—“সাংবাদিক”। এতে করে একজন ব্যক্তি নয়, গোটা সাংবাদিক সমাজ একযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।বিশেষ করে মফস্বল এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এখন সাংবাদিক পরিচয়ে অবাধে বিচরণ করছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। চোর-বাটপার, অটোচালক, মাদক কারবারি, দালাল এমনকি পেশাদার অপরাধীদের হাতেও দেখা যাচ্ছে প্রেস কার্ড। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে এবং বিপদে পড়লেই “আমি সাংবাদিক”—এই পরিচয় ব্যবহার করে পার পাওয়ার চেষ্টা করছে।অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আটক হওয়া এসব কথিত সাংবাদিকদের কাছ থেকে উদ্ধার হচ্ছে আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা কিংবা অস্তিত্বহীন অনলাইন মিডিয়ার আইডি কার্ড। যেসব প্রতিষ্ঠানের নেই নিয়মিত প্রকাশনা, নেই অফিস, নেই দায়িত্বশীল সম্পাদক—তারাই নির্লজ্জভাবে সাংবাদিক বানিয়ে যাচ্ছে।এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন প্রকৃত সাংবাদিকরা। মাঠে কাজ করতে গিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছে—“আপনিও কি ওই রকম?” এই একটি প্রশ্নই একজন সৎ সাংবাদিকের দীর্ঘদিনের শ্রম, সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।একই সঙ্গে সাংবাদিকতার কাঠামোগত শৃঙ্খলাও ভেঙে পড়ছে। জেলা প্রতিনিধি, উপজেলা প্রতিনিধি, স্টাফ রিপোর্টার কিংবা বিশেষ প্রতিনিধির মতো পদগুলো নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও সীমারেখার ভিত্তিতে গড়ে উঠলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। কেউ বিশেষ প্রতিনিধি পরিচয়ে পুরো জেলা চষে বেড়াচ্ছেন, কেউ স্টাফ রিপোর্টার পরিচয়ে সারা দেশ ঘুরছেন—তাও সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিকে না জানিয়ে। এতে একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংবাদ সংগ্রহের মান।এ ছাড়া আইপি টিভি ও অনলাইন মিডিয়ার অবাধ বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কোনো নীতিমালা না মেনেই গড়ে উঠছে একের পর এক আইপি টিভি। নেই নিবন্ধন, নেই সম্পাদকীয় নীতি, নেই জবাবদিহিতা। অথচ এসব মাধ্যমের পরিচয়ে মাঠে নামছে এমন অনেক ব্যক্তি, যাদের সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির সঙ্গেও পরিচয় নেই।এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে সাংবাদিকতা নামের এই মহান পেশা খুব দ্রুতই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। তখন সমাজের চোখে সাংবাদিক মানেই হবে সন্দেহজনক একজন ব্যক্তি—যা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য চরমভাবে বিপজ্জনক।বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সময় কঠোরভাবে এই অনিয়ম বন্ধ করার। প্রেস কার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে একটি শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।নচেৎ একদিন সমাজ প্রশ্ন করবে—সাংবাদিক কারা? যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, নাকি যারা শুধু একটি কার্ড ব্যবহার করে অপরাধ আড়াল করে?
Facebook Comments