Connect with us
Porikromanews 728x60 Banner

অর্থনীতি

ইরানে হামলায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে

Published

on

ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে আমেরিকা-ইসরাইল। প্রতিবাদে সর্বোচ্চ প্রতিশোধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তারই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক দেশটি। সক্রিয় হয়েছে বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রে থাকা ইরানের ছায়া শক্তিগুলো। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার সর্ববৃহৎ সরবরাহপথে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে তারা। চলমান ঘটনাপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধেরই ইংগিত দিচ্ছে বলে জানান নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। স্বাভাবিক কারণেই দেশবাসির মনে প্রশ্ন উঠেছে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কী প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর? কতটা ঝুঁকিতে পড়বে এদেশের অর্থনীতি? বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী-শিল্পপতি এবং অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ বাংলাদেশের রেমিটেন্সপ্রবাহে বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে দেশের উৎপাদন পর্যায়ে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আঘাত হানতে পারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়বে সব সেক্টরে। যদিও সরকার ঘোষণা দিয়েছে মার্চ মাসে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে না। যদিও বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাত মাসের উচ্চতার কাছাকাছি অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যই হলো বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস। তাই এই যুদ্ধ চলতে থাকলে দেশের জন্য জ্বালানির দাম ও সরবরাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) ও রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এশিয়া ও ইউরোপ এবং আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানোর প্রধান নৌপথ সুয়েজ খাল ইরানের খুব কাছাকাছি। সেখানে এই যুদ্ধের প্রভাব পড়লে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য পরিবহন ব্যাহত হবে। যুদ্ধের কারণে দেশের প্রবাসী আয় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জানিয়ে তারা বলেন, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি সেখানে নতুন শ্রমিক নিয়োগে অনাগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাত মাসের উচ্চতার কাছাকাছি অবস্থান করছে। দুই দেশের মধ্যে বৃহস্পতিবার আলোচনা নির্ধারিত রয়েছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪৩ সেন্ট বা ০.৬ শতাংশ বেড়ে ৭১.২০ ডলারে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ৩৮ সেন্ট বা ০.৬ শতাংশ বেড়ে ৬৬.০১ ডলারে পৌঁছায়। গত শুক্রবার ব্রেন্টের দাম ৩১ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে, আর সোমবার ডব্লিউটিআই ৪ আগস্টের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করে ইরানকে তার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে চাপ দিচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে ওপেকভুক্ত তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল উৎপাদনকারী ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকারী দেশগুলোর সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিশ্চয়তার অর্থ হলো বাজার বড় ধরনের ঝুঁকি প্রিমিয়াম ধরে রাখবে এবং নতুন যেকোনো ঘটনার প্রতি সংবেদনশীল থাকবে।
যদিও দেশে আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে না বলে জানিয়েছে সরকার। মার্চ মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এ হিসেবে ফেব্রুয়ারির মতো একই দামে মার্চে বিক্রি হবে পেট্রল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিনের মতো জ্বালানি তেল। রবিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক অফিস আদেশে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ভোক্তাপর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম মার্চে ১০০ টাকা। কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ১১২ টাকা। পেট্রলের দাম প্রতি লিটার ১১৬ টাকা। আর অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১২০ টাকা। ফেব্রুয়ারি মাসে একই দামে এসব জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। অপরিবর্তিত দাম ১ মার্চ থেকেই কার্যকর হয়েছে। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২ টাকা এবং ফেব্রুয়ারিতে আরও ২ টাকা করে কমানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ শুরু করে সরকার। সে হিসাবে আগের মাসে আমদানি করা জ্বালানি তেলের খরচ বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসে নতুন দাম সমন্বয় করা হয়।
গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আমরা একটি রপ্তানিনির্ভর দেশ, তাই আমাদের অবশ্যই এই যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে, বিশেষ করে পোশাক রপ্তানিকারকরা। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে ভোক্তাদের সক্ষমতা কমবে, ফলে তারা পোশাকের মতো পণ্যে কম ব্যয় করবেন। দ্বিতীয়ত, জ্বালালি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে দেশের বাজারে উৎপাদন খরচ বাড়বে, কারণ বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। তৃতীয়ত, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের যদি বিকল্প নৌপথ বেছে নিতে হয়, তাহলে সামগ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে বাংলাদেশি পোশাক ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধ দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে, কিন্তু সেই যুদ্ধ এখন চার বছর ধরে চলমান। তিনি বলেন, তাই যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে কুয়েত, ইরাক, ইরান, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রপ্তানি বাজার মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

💬 Click to view comments