Connect with us
Porikromanews 728x60 Banner

সর্বশেষ

বন বিভাগের হস্তক্ষেপে মায়ের কাছে ফিরেছে ‘বীরবাহাদুর’

Published

on

বন বিভাগের হস্তক্ষেপে মায়ের কাছে ফিরেছে ‘বীরবাহাদুর’
মা সুন্দরমালার সঙ্গে হস্তীশাবক বীরবাহাদুর। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায়ছবি: সংগৃহীত

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা এলাকায় সম্প্রতি ‘বীরবাহাদুর’ নামে সাত বছর বয়সী একটি হস্তীশাবককে সনাতন পদ্ধতিতে বেঁধে ‘হাদানি’ (প্রশিক্ষণ) দেওয়া হচ্ছিল। অবশেষে বন বিভাগের হস্তক্ষেপে শাবকটিকে মুক্ত করে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

৪২ বছর বয়সী পোষা হাতি সুন্দরমালার একমাত্র সন্তান বীরবাহাদুর। প্রশিক্ষণের জন্য মায়ের কাছ থেকে শাবকটিকে আলাদা করা হয়। তার পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে আটকে রাখা হয় প্রশিক্ষণস্থলে। প্রশিক্ষণে নিযুক্ত করা হয়েছিল পাঁচজন মাহুতকে। খবর পেয়ে বন বিভাগের লোকজন গিয়ে এ কাজে আপত্তি জানান। তাঁদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শুক্রবার বিকেলে হস্তীশাবকটিকে শৃঙ্খলমুক্ত করে স্থানীয় কালাপাহাড় জঙ্গলে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধার এলাকায় হস্তীশাবক প্রশিক্ষণের সময় নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গত ১ জানুয়ারি সরেজমিনে দেখা যায়, একটি ফাঁকা জমিতে দুই পাশে মাটিতে গভীর গর্ত করে পুঁতে রাখা গাছের খণ্ডের সঙ্গে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে হস্তীশাবক ‘বীরবাহাদুরকে’। তার সামনের দুটি ও পেছনের একটি পায়ে শক্ত করে দড়ি বাঁধা ছিল। শৃঙ্খলমুক্ত হতে বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে বীরবাহাদুর মাঝেমধ্যে উচ্চস্বরে ডাকছিল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাতিটির মালিক কর্মধার এলাকার বাসিন্দা সোনা মিয়া, যিনি প্রায় এক বছর আগে মারা যান। বর্তমানে তাঁর ছেলে মো. কামরুল ইসলাম হাতিগুলোর দেখভাল করছেন। তাঁদের মালিকানায় মোট চারটি হাতি রয়েছে, যার মধ্যে দুটির লাইসেন্স বন বিভাগ থেকে নেওয়া হয়েছে।

হাতিটির প্রশিক্ষণে নিয়োজিত প্রধান প্রশিক্ষক আশিক আলী জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এ পেশায় যুক্ত এবং এ পর্যন্ত নয়টি হাতিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হাদানি’ পদ্ধতিতে সাধারণত দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগে। এ সময়ে মাহুতের কথা ও ইশারা বোঝানোসহ বিভিন্ন শারীরিক কসরত শেখানো হয়। তিনি বলেন, মা হাতি কাছে থাকলে প্রশিক্ষণে বাধা সৃষ্টি করে—এমন ধারণা থেকেই পুরোনো আমল থেকে এভাবেই হাদানি চলে আসছে।

এলাকাবাসীর দাবি, মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হাতিগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাহাড়ি এলাকায় গাছ টানার কাজ ও বিভিন্ন সার্কাস বা প্রদর্শনীতে ভাড়ায় ব্যবহার করা হয় এসব হাতি।

বন বিভাগের কুলাউড়া রেঞ্জের নলডরি বিট কর্মকর্তা রতন চন্দ্র দাস জানান, সনাতন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণের সময় হাতির ওপর নির্যাতনের অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়। কর্মধার এলাকার হাতিটির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এলে নির্দেশনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলে গিয়ে মালিককে হাতিটি মুক্ত করতে বলা হয়। পরে হাতিটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

হাদানির বিকল্প আধুনিক পদ্ধতি

হাতি কল্যাণ নিয়ে কাজ করা ঢাকার প্রাণিসেবা প্রতিষ্ঠান ‘পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান রাকিবুল হক জানান, হাদানি পদ্ধতিতে হাতির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঝুঁকি বেশি। এর বিকল্প হিসেবে ‘পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট ট্রেনিং’ কার্যকর একটি আধুনিক পদ্ধতি। এতে হাতির বাচ্চাকে তার মায়ের সঙ্গে রেখেই কোনো নির্যাতন ছাড়াই প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, থাইল্যান্ডের ‘সেভ এলিফ্যান্ট ফাউন্ডেশন’-এর সহযোগিতায় এবং বন বিভাগের সমর্থনে তাঁরা এ পদ্ধতি বাস্তবায়নে কাজ করছেন। এর অংশ হিসেবে গাজীপুর সাফারি পার্কে তিন বছর বয়সী হস্তীশাবক ‘জয়িতা’-কে তার মা বেলকলির সঙ্গে রেখে সাত মাস ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আগে দুজন মাহুতকে এ পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাঁরাই এখন কার্যক্রমটি পরিচালনা করছেন। এতে ইতিবাচক ফল মিলছে বলে জানান তিনি।

বন বিভাগের অবস্থান

প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে হাতি প্রশিক্ষণের বিষয়ে বন বিভাগের দুজন কর্মকর্তা থাইল্যান্ডে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, যুগ যুগ ধরে সনাতন পদ্ধতিতে হাতি প্রশিক্ষণের ফলে প্রাণীগুলোকে ব্যাপক কষ্ট সহ্য করতে হয়। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে মালিক ও মাহুতদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। গাজীপুর সাফারি পার্কে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাহুতদের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সারা দেশে পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট ট্রেনিং ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আধুনিক ও মানবিক পদ্ধতি চালু করা গেলে হাতি কল্যাণ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়াও হবে আরও কার্যকর ও টেকসই।

💬 Click to view comments