আন্তর্জাতিক
‘ঢাকতে কেবল চাদর’: সুদানের বাস্তুচ্যুতদের কোস্তিতে চরম মানবিক সংকট
সুদানের কর্দোফান ও দারফুর অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ দক্ষিণ-মধ্য সুদানের কোস্তি শহরে আশ্রয় নিচ্ছে। তবে শহরটিতে আশ্রয় ও সহায়তার ব্যবস্থা সীমিত থাকায় এসব পরিবারকে খোলা আকাশের নিচে, ন্যূনতম সুরক্ষা ছাড়াই মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
কোস্তি শহরের উপকণ্ঠে একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে দেখা যায়, আজিজা নামের এক নারী তার সন্তানদের নিয়ে বালুকাময় খোলা জমিতে বসে আছেন। রোদ, বৃষ্টি কিংবা চরম আবহাওয়া থেকে রক্ষার মতো কোনো স্থায়ী কাঠামো নেই। যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসার দীর্ঘ ও কষ্টকর যাত্রার পর তাঁরা পাতলা চাদর দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ছাউনির নিচে রাত কাটাচ্ছেন।
আজিজা বলেন, পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, কেউ কারও খোঁজ জানে না। এই প্রচণ্ড গরমে একটি চাদরই তাঁদের একমাত্র আশ্রয়। একই আশ্রয়কেন্দ্রে আরেক নারী জানান, রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা কাপড় ও সামান্য উপকরণ দিয়ে তাঁবু বানাতে হয়েছে। হাতে থাকা সামান্য অর্থ মুহূর্তেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে শেষ হয়ে গেছে।
সংঘাতের বিস্তার ও বাস্তুচ্যুতি
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সুদানের যুদ্ধের প্রধান সংঘাতক্ষেত্র কর্দোফান ও দারফুর অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) ও সুদানী সশস্ত্র বাহিনীর (এসএএফ) মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ায় বেসামরিক নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, উত্তর দারফুরের এল-ফাশার শহরে আরএসএফের অভিযানে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং সহিংসতা, লুটপাট ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার ফলে হাজার হাজার মানুষ নিরাপত্তার খোঁজে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
পালিয়ে আসা মানুষের বড় অংশ নারী ও শিশু। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষরা সহিংসতার শিকার হয়েছেন অথবা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পরিবার থেকে আলাদা হয়ে পড়েছেন।
কোস্তিতে চাপ বাড়ছে
কোস্তি শহরটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হওয়ায় এখানে বাস্তুচ্যুত মানুষের নতুন ঢেউ আসছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত সাড়ে তিন হাজার মানুষ কোস্তিতে পৌঁছেছে। প্রতিদিন গড়ে ২৫টি পরিবার—প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন—এখানে আশ্রয় নিচ্ছে। কিছু পরিবারকে বড় তাঁবুতে রাখা হলেও অধিকাংশ নতুন আগতকে অস্থায়ী ও অপর্যাপ্ত আশ্রয়ে থাকতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, শুধু এল-ফাশার ও আশপাশের এলাকা থেকেই সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশজুড়ে সুদানে বর্তমানে ৯.৩ মিলিয়নের বেশি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ রয়েছে, যার অর্ধেকেরও বেশি শিশু। অনেক পরিবার খাদ্যসংকটে ভুগছে; এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুত পরিবারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের অন্তত একজন সদস্যকে পুরো দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে।
সহায়তা কমছে, সংকট বাড়ছে
চাহিদা দ্রুত বাড়লেও আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দাতা দেশগুলোর অর্থায়ন হ্রাসের কারণে বিভিন্ন সংস্থা সাহায্য কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে কোস্তির শিবিরগুলোতে চিকিৎসাসেবা সবচেয়ে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসাকর্মীর ঘাটতি, ওষুধের অভাব এবং অস্থায়ী হাসপাতালের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষ ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত হেঁটে বা বিভিন্ন দেশ ঘুরে কোস্তিতে পৌঁছেছেন। তারা ক্লান্ত, অপুষ্টিতে ভুগছেন এবং সামনে আসন্ন শীত নিয়ে উদ্বিগ্ন। মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করছে, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এবং সহায়তা না বাড়লে এই সংকট আরও গভীর হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবিলম্বে আন্তর্জাতিক সহায়তা জোরদার না করা হলে কোস্তিতে আশ্রয় নেওয়া হাজারো মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
