অপরাধ
কাগজ করতেই শতকোটি হাতিয়েছেন মাসুদ চৌধুরী
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাগজ প্রসেসিংয়ের নামে হাতিয়ে নিয়েছেন একশ কোটি ৭৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭২০ টাকা। ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি এজেন্সির মাধ্যমে ৯ হাজার ৩৭২ জন কর্মীর কাছ থেকে এই অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছেন তিনি।পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে সরকার নির্ধারিত ফি ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তার প্রতিষ্ঠান ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে প্রত্যেকের কাছ থেকে নিয়েছেন দেড় লাখ টাকা করে। এর বাইরে পাসপোর্ট খরচ, কভিড টেস্ট, মেডিকেল ও পোশাক ফি মিলিয়ে আরও সাড়ে ৩৬ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে একেকজনকে। এ হিসাবে ৯ হাজার ৩৭২ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ১ লাখ ৭ হাজার ৫১০ টাকা করে অতিরিক্ত আদায় করছেন। এ হিসাবে তিনি নিয়েছেন মোট ১০০ কোটি ৭৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭২০ টাকা।
২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩০ মে পর্যন্ত সময়ে এ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মাসুদ চৌধুরীর তার প্রতিষ্ঠান ফাইভ এমের মাধ্যমে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগ অনুসন্ধান শেষে গত বছরের ২৮ আগস্ট বনানী থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে। এ মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ ৩৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।গত মঙ্গলবার ওয়ান ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব হিসেবে পরিচিত এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সংসদ সদস্যকে মানব পাচারের একটি মামলায় গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
এদিকে মাসুদ চৌধুরীকে ডিবি গ্রেপ্তার করার পর সিআইডি তাদের কাছে থাকা মানিলন্ডারিং আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করেছে।মামলাটির তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সিআইডির তদন্তে ৯ হাজার ৩৭২ জনের কাছ থেকে একশ কোটির বেশি অর্থ আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। ডিবির রিমান্ড শেষে সিআইডিতে থাকা মামলাটির জন্য রিমান্ড আবেদন করা হবে।সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, মামলাটির তদন্ত চলমান আছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষে করে চার্জশিট দেওয়া হবে।এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে করা একটি মামলা তদন্ত করছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের করা মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মঈনউদ্দীন চৌধুরী এ বিষয়ে আসামির উপস্থিতিতে শুনানির জন্য আগামী ৯ এপ্রিল দিন ধার্য করেন। দুদকের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম এ তথ্য জানান।মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গত মঙ্গলবার গ্রেপ্তারের পর ডিবি জানিয়েছে, রাজধানীর বারিধারার একটি বাসা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফেনী জেলায় তিনটি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তা ছাড়া ফেনী জেলায় আরও তিনটি এবং ডিএমপির বিভিন্ন থানায় পাঁচটি মামলাসহ মোট ৮টি মামলা তদন্তাধীন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দুদক এবং সিআইডিতে একাধিক অভিযোগ তদন্তাধীন।২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে ছিলেন মাসুদ। পরে তিনি এক-এগারোর পটপরিবর্তনের পর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন। সে সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন তিনি। জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মাসুদই যৌথ বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে ধারণা করা হয়। ওই সময় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়ার ঘটনা ছিল প্রায় নিত্য ঘটনা।কথিত আছে, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।ফখরুদ্দীন সরকারের দেড় বছরের মাথায় ২০০৮ সালের জুনে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করে পাঠানো হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পরও তাকে দায়িত্বে রাখে। অবসরের সময় হয়ে গেলে তার চাকরির মেয়াদ ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।চাকরি থেকে অবসরের পর ঢাকায় একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল ব্যবসা শুরু করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। পাশাপাশি শুরু করেন জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা। ২০১৮ সালে তিনি এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির মনোনয়নে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে আওয়ামী লীগ থেকেও মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনি
